1. Q. Economy and society in the Vijayanagar empire with reference to the accounts of foreign travellers. (Marks: 20/30)
পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে একাধিক বিদেশী পর্যটক ও দূত বিজয়নগর রাজ্যে এসেছিলেন। এঁদের মধ্যে ইতালীয় পর্যটক নিকোলো কন্টি, পারসিক দূত ও পর্যটক আব্দুর রজ্জাক, পর্তুগিজ বণিক ও পর্যটক ডোমিঙ্গো পায়েজ, ফার্নাও নুনিজ ও এডোয়ার্ডো বারবোসা এবং রাশিয়ান পর্যটক নিকিতন-এর নাম করা যেতে পারে। প্রধানত এঁদের বিবরণীকে ভিত্তি করেই বিজয়নগর রাজ্যের সমকালীন অর্থনীতি ও সমাজের চিত্র নীচে আলোচিত হলো।
অর্থনৈতিক অবস্থা ও সমৃদ্ধি:বিদেশী পর্যটকদের বর্ণনায় বিজয়নগর ছিল সমকালীন বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী রাজ্য। আব্দুর রজ্জাক লিখেছেন, রাজার কোষাগারে একাধিক প্রকোষ্ঠ আছে, যার প্রতিটি তরল সোনায় পরিপূর্ণ। রাজ্যের সমস্ত মানুষ উচ্চ-নীচ, এমনকি বাজারের কারিগররাও, দেহের নানা অঙ্গে অলঙ্কারাদি পরিধান করত। এডোয়ার্ডো বারবোসা লিখেছেন, নগরটি ছিল সুবিস্তৃত, জনবহুল এবং বাণিজ্যে অগ্রণী। পেগুর সাথে হীরা, রুবি, চীন ও আলেকজান্দ্রিয়ার সাথে সিল্ক এবং মালাবারের সাথে চন্দনকাঠ, কর্পূর ও নানা ধরনের মসলার বাণিজ্য চলত।
বিজয়নগর রাজ্যের আর্থিক সচ্ছলতা প্রসঙ্গে প্রায় সকল বিদেশী পর্যটকই একমত এবং এই সমৃদ্ধির প্রধান উৎস ছিল কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের অগ্রগতি। কৃষিক্ষেত্রে বিজয়নগর ছিল খুবই উন্নত। ডোমিঙ্গো পায়েজ লিখেছেন, এদেশে প্রচুর ধান ও অন্যান্য শস্য উৎপন্ন হয়; কার্পাসের প্রচুর চাষ হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে রাজাদের সজাগ দৃষ্টি ছিল। বেশিসংখ্যক জমিকে সেচের আওতায় আনার জন্য এবং অনাবাদী জমিকে চাষযোগ্য করে তোলার জন্য সরকারের তরফে নানা ব্যবস্থা গৃহীত হয়। সরকারি আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি-রাজস্ব। সাধারণভাবে উৎপন্ন ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ ভূমি-রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো।
বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদন:কৃষির পরেই ছিল বাণিজ্যের স্থান। অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রেই বিজয়নগর ছিল অগ্রণী একটি রাজ্য। আব্দুর রজ্জাক এখানে তিনশো বন্দরের উল্লেখ করেছেন। মালাবার উপকূলে এযুগের ব্যস্ততম বন্দর ছিল কালিকট। পূর্ব-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ, ব্রহ্মদেশ, চীন, আরব, আবিসিনিয়া, পর্তুগাল প্রভৃতি দেশের সাথে বিজয়নগরের বহির্বাণিজ্য চলত। প্রধান রপ্তানি-দ্রব্যাদির মধ্যে ছিল নানাধরনের বস্ত্র, সুগন্ধি মসলা, চাল, চিনি, সোরা, লোহা ইত্যাদি। বিদেশ থেকে আমদানি হতো প্রধানত ঘোড়া, হাতি, তামা, কয়লা, পারদ, প্রবাল, ভেলভেট ইত্যাদি। স্থলপথ ও জলপথে অন্তর্দেশীয় বাণিজ্য চলত। উপকূলের বাণিজ্যে ছোট ছোট জলযান ব্যবহৃত হলেও বিজয়নগরে বড় জাহাজও তৈরি হতো।
শিল্প-উৎপাদনের ক্ষেত্রে বস্ত্র-শিল্প, খনি-শিল্প ও ধাতু-শিল্প ছিল প্রধান। এছাড়া সুগন্ধ দ্রব্য উৎপাদনেও বিজয়নগরের খ্যাতি ছিল। এ যুগে শিল্প ও বাণিজ্যে 'গিল্ড' বা বণিকসংঘের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। আব্দুর রজ্জাক লিখেছেন, এক এক ধরনের শিল্প বা ব্যবসার জন্য এক-একটি স্বতন্ত্র গিল্ড বা সংঘ গড়ে উঠত।
মুদ্রাব্যবস্থা ও সামাজিক অবস্থা:বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিজয়নগরে মুদ্রার প্রচলন ছিল। সোনা ও তামার মুদ্রার প্রচলন ছিল বেশি, তবে সামান্য পরিমাণ রৌপ্যমুদ্রাও প্রচলিত ছিল। সাধারণভাবে উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীভুক্ত লোকেদের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল এবং এঁরা বিলাসব্যসনে জীবন অতিবাহিত করতে অভ্যস্ত ছিলেন। দেশের সাধারণ মানুষ গরিব হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বা জীবনধারণের ন্যূনতম সংস্থানের অভাব কারো ক্ষেত্রে ছিল না।
বিজয়নগরের সমাজজীবনের বিস্তারিত চিত্র ফুটে উঠেছে বিদেশী পর্যটকদের বিবরণ থেকে। জাতিভেদ-প্রথা এবং আনুষঙ্গিক সামাজিক সম্পর্কের ধারা বিজয়নগরে বর্তমান ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণদের সর্বাধিক সম্মান ছিল। রাজারা ব্রাহ্মণদের বিশেষ মর্যাদা দিতেন, ফলে সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের পাশাপাশি রাজনীতিতেও তাঁদের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল। পর্যটক ফার্নাও নুনিজ ব্রাহ্মণদের সৎ, দক্ষ, পরিশ্রমী, তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন এবং হিসাবশাস্ত্রে পারদর্শী বলে অভিহিত করেছেন। এডোয়ার্ডো বারবোসা লিখেছেন, জাতিভেদ-প্রথা থাকলেও বিভিন্ন জাতির মধ্যে মেলামেশার কঠোরতা ছিল না।
নারীদের অবস্থান ও সামাজিক রীতি:বিজয়নগরের সমাজে নারীর বিশেষ মর্যাদা ছিল। রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে নারীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। মুষ্টিযুদ্ধ, অস্ত্রবিদ্যা, মল্লযুদ্ধ প্রভৃতি কাজেও নারীরা রপ্ত ছিলেন। সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়; গঙ্গাদেবী, তিরুমালাম্মা ছিলেন সে যুগের প্রখ্যাত কবি। ফার্নাও নুনিজ লিখেছেন, বিজয়নগরের রাজা নারী-মল্লযোদ্ধা, নারী দ্বাররক্ষী, নারী-জ্যোতিষী ও নারী-হিসাবরক্ষক নিয়োগ করতেন। বিদেশীদের বিবরণে বিজয়নগরে নারীদের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—গৃহস্থঘরের নারী ও স্বাধীন পেশাজীবী নারী।
সমাজে বাল্যবিবাহ, পুরুষদের বহুবিবাহ এবং সতীদাহ-প্রথা প্রচলিত ছিল। সচ্ছলশ্রেণীর লোকের বিবাহে পণপ্রথার ব্যাপকতা ছিল। বিদেশী পর্যটকেরা রাজাদের অসংখ্য পত্নী দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। নুনিজ লিখেছেন, রাজা অচ্যুত রায়ের পত্নীর সংখ্যা ছিল পাঁচশত। পায়েজের বিবরণ থেকে জানা যায়, রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের আইনসম্মত বারোজন রানী ছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, বিদেশী পর্যটকদের বিবরণ থেকে বিজয়নগরের অর্থনীতি ও সমাজের সামগ্রিক চিত্র হয়তো সম্পূর্ণ পরিস্ফুট হয় না (কারণ তাঁদের অধিকাংশের অভিজ্ঞতা ছিল নগরকেন্দ্রিক), তথাপি সমকালীন বিজয়নগরের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই সকল বিদেশী পর্যটকদের বিবরণীর গুরুত্ব অপরিসীম।
2. Q. Write a short note on the Sabha and the Samiti. (Marks: 10)
ঋগ্বেদে সভা ও সমিতি নামে দুটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ আছে। অধ্যাপক লুডউইগের মতে, সভা ছিল উপজাতির প্রধানদের নির্বাচিত পরিষদ এবং সমিতি ছিল উপজাতির সর্বসাধারণের পরিষদ।
সমিতি: সমিতির অধিবেশনে রাজা, অভিজাত বা প্রধান ব্যক্তিরা ও সাধারণ জনগণ একত্রে মিলিত হতেন। সমিতি রাজাকে কর্তব্যের নির্দেশ দিতে পারত। প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিঃসন্দেহে সমিতির ক্ষমতা অনেক বেশি ছিল এবং সমিতিই ছিল শাসন ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র। রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতেও ঋগ্বেদের যুগে সমিতির ক্ষমতা কম ছিল না। রাজা সমিতির অধিবেশনে পৌরোহিত্য করতেন এবং সদস্যদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন, তবে সমিতিতে একবার কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা অমান্য করার অধিকার তাঁর ছিল না। ঋগ্বেদের সর্বশেষ স্তোত্রে সমিতির সদস্যদের বলা হয়েছে তাঁরা যেন একসঙ্গে চলেন (সংগচ্ছধ্বম্), এক সুরে কথা বলেন (সংবদধ্বম্) এবং তাঁদের মন ও সংকল্প যেন একসূত্রে গাঁথা থাকে। পরবর্তী বৈদিক যুগে রাজার ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধির ফলে সমিতির ক্ষমতা অনেকটা কমে যায়।
সভা: সভার সদস্যসংখ্যা সমিতির তুলনায় অনেক কম ছিল। সভা ছিল বয়োজ্যেষ্ঠ ও জ্ঞানবৃদ্ধদের প্রতিষ্ঠান। প্রারম্ভিক বৈদিক যুগে এখানে মহিলাদের প্রবেশাধিকার থাকলেও পরে তা বন্ধ হয়। ঋগ্বেদ থেকে জানা যায় যে সভায় সামাজিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আলোচনা ও খেলাধুলার আয়োজনও হতো। সমিতির মতো অত সক্রিয় না হলেও রাজার কার্যকলাপের ওপর সভা সতর্ক দৃষ্টি রাখত। পরবর্তী বৈদিক যুগে তুলনামূলকভাবে সভার প্রভাব বাড়ে এবং রাজা সভার সম্মতি নিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা উপযুক্ত মনে করতেন।
3. Q. Write an account of the character of the Revolt of 1857 with special emphasis on recent researches. (Marks: 40)
১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের চরিত্র নির্ধারণের প্রধান অন্তরায় সমকালীন ঐতিহাসিক তথ্যের অভাব। বিদ্রোহী নেতা এবং বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত অপরাপর ব্যক্তিগণ এমন কোনো রচনা বা দলিল রেখে যাননি যার ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা সহজ হয়। ফলে আমাদের ব্রিটিশ সরকারের দলিলপত্র ও ইংরেজ ঐতিহাসিকদের রচনার ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণার ফলে মহাবিদ্রোহ সম্পর্কে তৃণমূল স্তরে অনেক নতুন তথ্য সংগৃহীত হয়েছে এবং বিশেষ করে মহাবিদ্রোহের দেড়শো বছর পূর্তি উপলক্ষে এই ইতিহাসচর্চা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সমকালীন ও সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি:মহাবিদ্রোহের চরিত্র সম্পর্কে সমসাময়িক ব্রিটিশ লেখকগণ দু-ভাগে বিভক্ত ছিলেন। জেবিনটন তাঁর Topics for Indian Statesman গ্রন্থে লিখেছেন, এটি কেবল সিপাহী বিদ্রোহ ছিল না, এটি গণবিদ্রোহের রূপ নিয়েছিল। ডাফ, ম্যালেসন, জন কে ও চার্লস বল এই মত সমর্থন করেন। কিন্তু চার্লস রেকস তাঁর Notes on the Revolt in North Western Province of India-তে এটিকে নিছক সিপাহী বিদ্রোহ বলেছেন। দুর্গাদাস বন্দোপাধ্যায়, কিশোরী চাঁদ মিত্র, হরিশচন্দ্র মুখার্জি ও স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মতো সমসাময়িক ভারতীয় লেখকরাও মূলত সিপাহী বিদ্রোহের মতকে সমর্থন করেছিলেন। স্যার জন লরেন্স ও সিলি এটিকে স্বার্থপর সিপাহীদের বিদ্রোহ বলেছেন, আর রিজ এটিকে ধর্মান্ধদের আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জাতীয়তাবাদী ও সংশয়বাদী মতবাদ:জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে এটি জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম। বিনায়ক দামোদর সাভারকর এটিকে 'ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' আখ্যা দিয়েছেন। ঐতিহাসিক শশিভূষণ চৌধুরী তাঁর Civil Rebellion in the Indian Mutinies গ্রন্থে এটিকে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী গণবিদ্রোহ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অপরদিকে ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার এটিকে 'জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ' হিসেবে মানতে নারাজ। তাঁর মতে এটি মূলত উত্তরপ্রদেশ কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ বিদ্রোহ ছিল এবং ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল এতে যোগ দেয়নি। বিদ্রোহের নেতারা জাতীয়তাবাদী চেতনায় নয়, বরং নিজস্ব ক্ষোভ ও সংকির্ণ স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন। ডঃ সুরেন্দ্রনাথ সেন তাঁর Eighteen Fifty Seven গ্রন্থে বলেছেন, এটি বিচ্ছিন্ন সামন্তপ্রভুদের ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ছিল এবং এতে কোনো জাতীয় স্তরের সুসংবদ্ধ পরিকল্পনা ছিল না।
মার্কসবাদী ও আধুনিক কেমব্রিজ দৃষ্টিভঙ্গি:কার্ল মার্কস New York Daily Tribune পত্রিকায় এটিকে "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম" বললেও, রজনীপাম দত্ত একে পতনোন্মুখ সামন্তপ্রভুদের প্রতিক্রিয়াশীল প্রয়াস বলেছেন। তবে প্রমোদ সেনগুপ্ত ও সুপ্রকাশ রায় দেখিয়েছেন যে লক্ষ্ণৌ, অযোধ্যা ও বিহারে এটি প্রকৃত গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছিল, যেখানে সিপাহীদের পাশাপাশি কৃষক ও সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ ও তাদের অনুগত জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
কেমব্রিজ ঐতিহাসিক এরিক স্টোকস সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে খাটো করে দেখলেও, সি.এ. বেইলি দেখিয়েছেন যে অসামরিক মানুষের ক্ষোভ ও সিপাহীদের অভ্যুত্থান একে অপরকে শক্তিশালী করেছিল। টমাস মেটকাফ ও শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন যে বিদ্রোহে আধুনিক জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ না থাকলেও, ব্রিটিশ রাষ্ট্রের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা বিদ্রোহীদের এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল।
সাম্প্রতিক গবেষণা ও মূল্যায়ন:রুদ্রাংশু মুখার্জি তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে অযোধ্যার উদাহরণে সাধারণ কৃষক ও হস্তশিল্পীদের 'Pressure from below' বা নিচুতলার মানুষের চাপের ফলেই অনেক তালুকদার বিদ্রোহে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি সিপাহীদের 'উর্দিপরা কৃষক' হিসেবে আখ্যায়িত করে সিপাহী-কৃষক চেতনার সমন্বয়কে 'জাতীয়তাবাদ-পূর্ব দেশপ্রেম' (Pre-nationalist patriotism) বলে উল্লেখ করেছেন।
উপসংহারে বলা যায়, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ আধুনিক অর্থে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম না হলেও, এটি নিছক সিপাহী বিদ্রোহের গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছিল।
4. Q. What do you understand by the 'Cuban Missile Crisis'? (Marks: 20)
১৯৫০-এর দশকে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের (Cold War) মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ১৯৬২ সালে এক চরম আন্তর্জাতিক সংকটের সৃষ্টি করে, যা বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল। এই সংকটই 'কিউবার মিসাইল সংকট' (Cuban Missile Crisis) নামে পরিচিত।
পটভূমি ও কাস্ত্রোর বিপ্লব:পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপ কিউবার অর্থনীতি বিংশ শতকের প্রথমার্ধে মার্কিন পুঁজি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। ১৯৫২ সালে মার্কিন সমর্থিত স্বৈরাচারী বাতিস্তা সরকার ক্ষমতা দখল করলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সফল বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটে। কাস্ত্রো সোভিয়েত রাশিয়া ও সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান এবং বিদেশী শিল্প ও খামার জাতীয়করণ করেন, যা আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।
বে অফ পিগস আক্রমণ ও সোভিয়েত পদক্ষেপ:১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সিআইএ-র সহায়তায় কাস্ত্রো-বিরোধী শরণার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে 'Bay of Pigs' (শূকর উপসাগর)-এ ব্যর্থ সামরিক হামলা চালায়। এই হামলার পর ফিদেল কাস্ত্রো কিউবাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। কিউবার নিরাপত্তার অজুহাতে এবং তুরস্কে মার্কিন 'জুপিটার' ক্ষেপণাস্ঘাঁটির জবাব দিতে সোভিয়েত প্রধান নিকিতা ক্রুশ্চেভ কিউবায় মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র (Missile Launcher) স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
সংকটের চরম মুহূর্ত (অক্টোবর ১৯৬২):১৯৬২ সালের অক্টোবরে মার্কিন গুপ্তচর বিমানে কিউবায় অবস্থিত সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ছবি ধরা পড়লে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ২২ অক্টোবর কিউবার চারপাশে নৌ-অবরোধ (Naval Blockade) ঘোষণা করেন। কেনেডি স্পষ্ট জানান, কিউবা থেকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হলে তার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে দায়ী করে পাল্টা আক্রমণ চালানো হবে। জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলে বিশ্ব চরম পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কায় স্থবির হয়ে পড়ে।
সংকট নিরসন ও প্রভাব:জাতিসংঘের মহাসচিব ইউ থ্যান্টের মধ্যস্থতায় এবং দুই রাষ্ট্রপ্রধানের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অবশেষে সংকট কাটে। ২৬-২৭ অক্টোবরের আলোচনায় ক্রুশ্চেভ কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে রাজি হন; বিনিময়ে কেনেডি প্রতিশ্রুতি দেন যে আমেরিকা আর কিউবা আক্রমণ করবে না এবং পরবর্তীতে তুরস্ক থেকে মার্কিন জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
এই সংকটের মাধ্যমে দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্র উপলব্ধি করে যে পরমাণু যুদ্ধ কারোর জন্যই লাভজনক নয়। ফলে পরবর্তীকালে দু-পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন বা আলাপ-আলোচনার নতুন অধ্যায় শুরু হয়, যা ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ইতিহাসে 'দাঁতাত' (Détente) নামে পরিচিত।
