বাংলার পেডাগোজী: Learn & Acquisition
শিখন (Learning)
শিখন কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল শেখা। এটি শিশুর জন্মকালব্যাপী বৃদ্ধি ও বিকাশের ক্ষেত্রকে সচল রাখার রীতিবিশেষ। অর্থাৎ শিখন হল কর্মসম্পাদন রীতি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। শিখন হল সেই প্রক্রিয়া যার সাহায্যে ব্যক্তি নতুন আচরণ সম্পন্ন করার দক্ষতা অর্জন করে। শিশুর ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
শিখন প্রসঙ্গে বিভিন্ন মনোবিদের মতবাদ:
- উডওয়ার্থ: শিখন বলতে সেই ধরনের সক্রিয়তাকে বলেছেন যা ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন আনে এবং ব্যক্তির পূর্ববর্তী আচরণ ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তন ঘটায়।
- বার্নাড: শিখন হল আচরণের পরিবর্তন।
- স্মিথ: অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন আচরণ আয়ত্ত করা, পুরাতন আচরণকে শক্তিশালী বা দুর্বল করার প্রক্রিয়াই হল শিখন।
- চক্রা অ্যান্ড চক্রা: শিখন হল অভ্যাস মনোভাব গঠন ও জ্ঞানঅর্জনের প্রক্রিয়া।
শিখনের বৈশিষ্ট্য:
- শিখনের দ্বারা ব্যক্তি নতুন আচরণ সম্বন্ধে যোগ্যতা অর্জন করে।
- শিখনের ফলে বিকাশ ঘটে।
- ব্যক্তির আত্মসক্রিয়তাকে জাগিয়ে তোলে।
- শিখন সর্বজনীন ও ধারাবাহিক।
- শিখন উদ্দেশ্যমুখী প্রক্রিয়া।
- এটি সর্বদা কোনো না কোনো চাহিদা পূরণ করে।
ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে শিখনের উপাদানের গুরুত্ব:
অভিযোজিত উপায়ে পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে সার্থকভাবে মানিয়ে নেওয়ার জন্য শিখন প্রক্রিয়া প্রয়োজন। শিখন সহায়ক উপাদানগুলি হল-
- (1) পরিনমন: এই বিষয়টির দ্বারা শিশু তার বৃদ্ধি বিকাশের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন ছাড়া শিখন নিরপেক্ষ ভাবে ভাষাকে রপ্ত করতে পারে। এটি স্বাধীন ও সর্বোজনীন প্রক্রিয়া।
- (2) আগ্রহ বা অনুরাগ: এটি আভ্যন্তরিন মানসিক বিষয়টির দ্বারা শিশু শিক্ষা অর্জন করে।
- (3) মনোযোগ: এই মানসিক বিষয়টির দ্বারা শিক্ষার্থীর ভাষা সংক্রান্ত সুস্পষ্ট জ্ঞানলাভের জন্য নিজের চেতনাকে নির্দিষ্ট করে।
- (4) ক্ষমতা বা সামর্থ্য: ভাষাকে মাধ্যম করে ব্যক্তি কর্ম সম্পাদনের জন্য এই উপাদানটি বিশেষ সহায়ক।
- (5) প্রেষণা: এর অর্থ কর্মের ইচ্ছা বা উৎস্য, এই বিষয়টির দ্বারা ব্যক্তি ভাষাকে সহায়ক করে কর্মের সাফল্য লাভ করে।
গ্রহন ক্ষমতা (Acquisition)
গ্রহন ক্ষমতা হল একটি অবচেতন প্রক্রিয়া, যা ভাষা বোধের অর্থবহ সংযোগের জন্য ভাষার সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর ভাষার বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ-স্বাভাবিক পরিবেশে কোনো ব্যাবহারিক কৌশল প্রয়োগ ছাড়াই শিশুরা যে ভাষা শেখে তাকেই বলা হয় গ্রহন ক্ষমতা বা acquisition.
বৈশিষ্ট্য:
- শিশুরা অবচেতন ভাবে শেখে।
- নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়না।
- ভাষা শিক্ষার থেকে প্রেষনা স্বাভাবিক ভাবে সৃষ্টি হয়।
- প্রথম ভাষা বা মাতৃভাষা শিক্ষাগ্রহন ক্ষমতার মাধ্যমে হয়।
বিশিষ্ট ভাষাবিদ চমস্কির মতে কেবলমাত্র মানব শিশুই ভাষা শেখার জন্মগত ক্ষমতার অধিকারী। কীভাবে শিশুরা মাতৃভাষা শেখে তা নিয়ে চমস্কি মনে করেছিলেন- শিশুর মধ্যেই ভাষা শিক্ষার উপায় (Language Acquisition Devise বা LAD) বা ভাষা শিক্ষার প্রণালী (Language Acquisition System বা LAS) কাজ করে তার ফলে শিশু এত তাড়াতাড়ি ভাষা শিখতে পারে।
বিভিন্ন বয়স শিশুর ভাষার বিকাশ
| বয়স | ভাষার বিকাশ |
|---|---|
| জন্মের পর | কাঁদা |
| ২-৪ মাস | কুঁই-কুঁই (Cooing) |
| ৪-৬ মাস | আধো আধো স্বরে কথা বলা (Babbling) |
| ১২ মাস | এক শব্দের বচন |
| ১৮ মাস | দুই শব্দের বচন |
| ২ বছর | বড়ো শব্দের বচন |
| ২-৩ বছর | ছোটো বাক্য ও প্রশ্ন করা |
| ৩ বছর | একাধিক বাক্য পড়তে পারে, সময় বলাতে পারে, উল্টো বর্ণ লেখার অভ্যাস হ্রাস পায়। |
| ৪ বছর | একাধিক অর্থযুক্ত শব্দ বুঝতে পারে। |
| ৯ বছর | ঘটনা বা বস্তুকে বিশদ ভাবে বর্ণনা করতে পারে। |
| ১০ বছর | পরিনত ভাষার দক্ষতা ও ব্যাকরণের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। |
ভাষার সঙ্গে শিখনের সম্পর্ক
- পৃথিবীর সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাষাই প্রধান মাধ্যম। তাই শিশু ভাষা শিখনের তাগিদ অনুভব করে।
- ভাষার সাহায্যে শিশু নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয় এবং সমস্যা সমাধান করে।
- ভাষা শিক্ষার দ্বারাই শিক্ষার্থীর সকল চাহিদা পূরণ হয়।
- শিক্ষার্থীর মানসিক উন্নতি ও অবনতি ভাষা শিখনের ফলে ঘটে।
- জ্ঞান অর্জন, আচরণের পুনরাবৃত্তি, দক্ষতা অর্জন ছাড়াও ভাষা শিখনের ফলে অভিজ্ঞতা সমূহের পুনঃগঠন হয়।
শিশু ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে স্তর
স্তর: 1. প্রাক প্রাথমিক স্তর। 2. প্রাথমিক স্তর। 3. নিম্ন মাধ্যমিক স্তর।
প্রাক প্রাথমিক স্তর:
- অতি শৈশবে শিশু কান্নার মধ্য দিয়ে ভাব প্রকাশ করে।
- ২-৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর জীবনে ভাষা শিক্ষার প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে। এটি প্রস্তুতির কাল। শিশু ছবি ও ছড়া ভালোবাসে বলে তাকে ছবির বই ও ছড়াতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।
- ভাষা শিক্ষাকাল ছাড়া আবৃত্তিতে জোর দিতে হবে।
প্রাক প্রাথমিক স্তরে ভাষা শিক্ষাদানের পদ্ধতি:
- আগে ভাষা ও পরে বর্ণমালা: কয়েকটি পরিচিত শব্দ বেছে নিয়ে সেগুলিকে লিখতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। এটি ভাষা শিক্ষার প্রস্তুতি পর্ব। লেখার উপর গুরুত্ব আরোপ। পাঠ্য পুস্তক ব্যাতীত নানা অভিধান খেলাধূলা বিষয়ক বই পড়তে দিতে হবে।
- ইন্দ্রিয় সচেতনতার মাধ্যমে শিক্ষা: বাগ যন্ত্র, কান, চোখ, নাক ব্যবহারে শিশুদের দক্ষ করে তুলতে হবে।
- শব্দের প্রতীকতায় যথার্থ উপলব্ধি: পারিপার্শ্বিক পরিবেশে অবস্থিত বিভিন্ন জিনিসের নাম জানতে সাহায্য করতে হবে।
প্রাথমিক স্তর:
এই স্তরের বয়স ৬-১০ বছর। মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে। শব্দ সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
প্রাথমিক স্তরে ভাষাশিক্ষাদানের বিভিন্ন পদ্ধতি:
- বর্ণক্রম পদ্ধতি (Alphabetic Method): এই পদ্ধতিতে একের পর এক বর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রথমে স্বরবর্ণ ও পরে ব্যাঞ্জনবর্ণ। বর্ণগুলি ভালো ভাবে আয়ত্ত হবার পর তাদের ছোট ছোট পরিচিতশব্দ শিক্ষা দেওয়া হয়।
- শব্দক্রম পদ্ধতি (Word Method): এই পদ্ধতিতে পরিচিত শব্দের সঙ্গে পরিচয় করাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থকেও জানাতে হবে। উদা: অ- অজয়, অপর, আ- আম, আলু, আমরা।
- বাক্যক্রম পদ্ধতি (Sentence Method): পরিচিত শব্দ দিয়ে ছোট ছোট বাক্য গঠন করতে হবে। উদা: আমি ভাত খাই।
- ধ্বনিসাম্য পদ্ধতি (Phonetic Method): এই পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি ধ্বনিসাম্য যুক্ত শব্দগুলির দ্বারা ভাষা শিক্ষা দিতে হবে। যেমন- জল, ফল, কল, চল, মল।
- গল্প বলা পদ্ধতি (Story telling Method): শিশুদের আকর্ষণীয় গল্প বলার মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে।
- দেখা ও বলা পদ্ধতি (Look and say Method): শিশুকে কোনো ছবি/বস্তু, প্রাণী, গাছ প্রভৃতির ছবি দেখিয়ে সেগুলির নাম বলতে হয়।
- আবৃত্তি পদ্ধতি (Recitation Method): ছড়া ও আবৃত্তি করার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হত।
- লিঙ্গাফোন পদ্ধতি (Linguaphone Method): কিছু বিশুদ্ধ পাঠ রেকর্ড করে শিশুদের বার বার শুনিয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়।
নিম্ন মাধ্যমিক স্তর:
বিদ্যালয় স্তরের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম হল নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়। শিক্ষার্থীর গড় বয়স ১১-১৪ বছর। এই স্তর বয়ঃসন্ধিকালের স্তর। এই স্তরে নানা চাহিদা দেখা যায়- স্বাধীনতা ও সক্রিয়তার চাহিদা, আত্মপ্রকাশের চাহিদা, আত্মনির্ভরতার চাহিদা, নীতিবোধের চাহিদা।
ভাষা শিক্ষাদানের পদ্ধতি:
- শিশুর প্রকাশ ক্ষমতায় উৎসাহ বৃদ্ধি, ভ্রমণ পথের বর্ণনা।
- ভাষা অনুশীলনে সহ পাঠক্রমিক কার্যাবলিতে গুরুত্ব। সুষ্ঠ ভাষা সাহিত্য অনুশীলনে গ্রন্থাগারের ব্যবহার। নীরব পাঠে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।
- Collection Book প্রয়োজনীয় -এতে বিভিন্ন মনীষীর জন্ম, মৃত্যু, তারিখ, প্রবন্ধের উদ্ধৃতি, গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য লিখিত থাকবে।
- শিক্ষক মহাশয় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা দান করার সময় teaching aids ব্যবহার করবেন। এক্ষেত্রে তিনি ব্যাকরণ বানান প্রভৃতি শিক্ষাদানে মনোবিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করবেন।
- শিক্ষার্থীরা যাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষা মনস্তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের পাঠক্রম রচনা করতে হবে।
- সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে যাতে ছাত্ররা সাহিত্য রসের আস্বাদন করতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। দেওয়াল পত্রিকা, সাময়িক পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে তাদের প্রবৃত্তি সমূহের উন্নয়ন ঘটানো। লেখার style বা শৈলী সম্পর্কে তাদের ধারনা দিতে হবে।
Basic of Language Teaching (ভাষা শিখনের মূল নীতি)
আধুনিক শিক্ষা হল শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা। শিশু কেন্দ্রিক শিক্ষায় মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বিষয়টিকে প্রায় সকল মনোবিদ ও ভাষাবিদগণ স্বীকার করে নিয়েছেন। তারা মাতৃভাষাকে মাতৃ দুগ্ধ ঘন করে তোলার চেষ্টা করেছেন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মনোবিজ্ঞান নির্ভর হওয়ায় শিক্ষাদানের নীতি ও পদ্ধতি আরোপিত হয়েছে।
১. মনোবৈজ্ঞানিক পথে শিক্ষা দান:
আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি মনোবিজ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই শিক্ষার্থীর মনকে বাদ দিয়ে শিক্ষা হতে পারে না। শিক্ষনীয় বিষয় গুলিকে শিক্ষার্থীর সামনে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য নিম্নোক্ত মনোবৈজ্ঞানিক নীতি গুলিকে পালন করা অবশ্যই ভাষা শিক্ষকের কর্তব্য:
- জানা থেকে অজানা (From Known to Unknown): পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন।
- মূর্ত থেকে বিমূর্ত (From Concrete to Abstract): মূর্ত বস্তু শিশুর কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। মূর্ত বস্তুকে কেন্দ্র করে শিক্ষা দেওয়া উচিত।
- সমগ্র থেকে অংশ (From Whole to Parts): সমগ্র বিষয় থেকে ধীরে ধীরে অংশ শিখনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
- বিশেষ থেকে সাধারন (From Particular to General): বিশেষ বিশেষ অভিজ্ঞতাকে আলাদা আলাদা ভাবে তুলে ধরে পরে তা একসঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে হবে।
- সহজ থেকে জটিল (From Simple to Complex): সহজ ও সরল অভিজ্ঞতা থেকে জটিল অভিজ্ঞতা প্রদর্শনে মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে।
- বিশ্লেষণ থেকে সংশ্লেষণ (From Analysis to Synthesis): প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের ধারনা তারপর একত্রীকরন করা।
২. শিখন তত্ত্বের প্রয়োগে বা শিক্ষানীতির সাহায্যে শিক্ষাদান:
যেহেতু শিখন হল আচরণ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া তাই ভাষা শিখনের ক্ষেত্রে শিখনের ঐ তত্ত্ব গুলি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- (i) থর্নডাইকের প্রচেষ্টা ও ভুল পদ্ধতি (Trial and Error Theory of learning): থর্নডাইক 'Animal Intelligence' জার্নালে প্রাণীর শিখন সম্পর্কিত তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তাঁর মতে উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি হলে প্রাণীর শিখন ঘটে। তাই তার তত্ত্বকে সংযোগবাদ বলা হয়। উদ্দীপকও প্রতিক্রিয়ার বন্ধন কে SR বন্ড বলেছেন। যখনই উদ্দীপক প্রাণীর সামনে আসবে তখনই প্রাণী একই ভাবে প্রতিক্রিয়া করবে। প্রাণী সফল হওয়ার জন্য বার বার চেষ্টা করবে। অনেক চেষ্টাই ব্যার্থ হবে এবং শেষ চেষ্টা এক সময়না এক সময় সফল হবে। এই সফল চেষ্টা বার বার অনুশীলন করলে শিখন হবে।
মুখ্য সূত্র: (1) প্রস্তুতির সূত্র, (2) অনুশীলনের সূত্র, (3) ফললাভের সূত্র।
গৌনসূত্র: (1) বহুমুখী প্রতিক্রিয়ার সূত্র, (2) মানসিক প্রতিক্রিয়ার সূত্র, (3) আংশিক প্রতিক্রিয়ার সূত্র, (4) সাদৃশ্যের সূত্র, (5) অনুসঙ্গ মূলক সঞ্চালনের সূত্র। - (ii) প্যাভলভের অনুবর্তন বাদ (Pavlov's Theory of Conditioning): রাশিয়ার শরীর তত্ত্ববিদ প্যাভলভ প্রাচীন অনুর্বর্তন বাদের প্রবক্তা। তাঁর তত্ত্বের মূল কথা হল ছাত্র ও বিষয় বস্তুর মধ্যে সংযোগ স্থাপন। প্যাভলভ বলেন যদি কোনো স্বাভাবিক উদ্দীপকের সঙ্গে বা ঠিক আগে কৃত্রিম বা নিরপেক্ষ উদ্দীপক বার বার উপস্থাপন করা হয় তবে ঐ স্বাভাবিক উদ্দীপক ছাড়াই কৃত্রিম উদ্দীপকটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন যে স্বাভাবিক উদ্দীপক আর শ্রোতা মনোযোগ সহকারে কানে শুনে বক্তার কথার অর্থ বুঝতে পারে।
শ্রবণ ও কথন
শ্রবণের প্রয়োজনীয়তা:
- ভাষা শেখার জন্য।
- ভাষার ব্যবহারের জন্য।
- ঠিক ও শুদ্ধ উচ্চারনের জন্য।
- অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য।
- গনসংযোগ রক্ষার জন্য।
শ্রবণের সাহায্যকারী উপাদান:
1. মাধ্যম (বায়ু, জল, তরঙ্গ), 2. বক্তা শ্রোতার মধ্যে ভাবের আদান প্রদান, 3. স্বর যন্ত্র ও শ্রবন যন্ত্র, 4. মনোভাব ও মনোযোগ, 5. ধ্বনি শব্দের উচ্চারন ও তার নীতি ও নিয়ম।
শ্রবণ প্রক্রিয়া শেখানোর কৌশল:
- বক্তার শ্রোতার মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
- ভাষা শোনার কৌশল/পদ্ধতির শেখানো।
- শ্রবণ কৌশল অনুশীলনের জন্য শ্রোতাকে কিছু শোনার কাজ দেওয়া।
- শ্রোতাদের বারে বারে শ্রবণ কৌশল ব্যবহারের জন্য উৎসাহ দেওয়া।
- শ্রোতাদের শ্রুতি লিখনে অংশগ্রহন করানো।
কখন কি?
শ্রোতা শ্রবণে অংশগ্রহন করার পরে বস্তারূপে কথন ক্রিয়ায় অংশগ্রহন করে। তাই শ্রবণ ও কথন একে অপরের পরিপূরক। শিশু জন্মাবার পরেই শুনতে পারেনা। কারণ তখন তার শ্রবণযন্ত্র সম্পূর্ণ গঠিত হয় না। তা সুগঠিত হতে আরও ৪-৫ মাস সময় লাগে, তার পর শিশু কোনো শব্দ শুনতে পায়। শিশু শব্দ শুনতে পারার ৫-৬ মাস পরে আধো আধো কিছু শব্দ উচ্চারন করতে শেখে। তাই কোনো শিশু আগে শ্রবণ ও পরে কথনে ভূমিকা নেয়।
কথনের প্রয়োজনীয়তা:
- মনের ভাব বহিঃপ্রকাশে সাহায্য করে।
- অপরের সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করে।
- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটায়।
- জাতীয়তাবোধ গড়ে তোলে।
- ব্যক্তিত্ব প্রকাশে সাহায্য করে।
- ব্যাক্তির ভাষা জ্ঞানের প্রয়োগ ও উন্নয়নে সাহায্য করে।
কথন উৎসাহের জন্য সামগ্রী বা পরিস্থিতি:
1. ভাষণ, ঘোষণা, তাৎক্ষণিক বক্তিতায় অংশগ্রহন। 2. নাটক-যাত্রা-অভিনয়। 3. বেতার/টেলিভিষন অনুষ্ঠান। 4. টেলিফোন/দূরাভাষের ব্যবহার। 5. গ্রহম পরিষেবা।
শিক্ষকের ভূমিকা:
শিক্ষক একটি বক্তব্য বলার পরে শিক্ষার্থী সমগ্র বিষয়গুলি শোনে এবং তা বোঝার চেষ্টা করে। শিক্ষাদানের সময় শিক্ষার যে বিষয়গুলির প্রতি একান্ত নজর দেওয়া প্রয়োজন তা হল-
- শিক্ষক কোনো আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করবেন না। মানা চলিত ভাষায় শিক্ষাদান করে থাকবেন।
- শিক্ষকের পরিবেশন ভঙ্গি হবে মনোরম। বিষয়টির মধ্যে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিকতা থাকবে।
- সহজ সরল ভাবে বক্তব্য প্রদান করতে হবে।
- শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝতে পারছে কিনা তা জানার জন্য মাঝে মাঝে তাকে প্রশ্ন করতে হবে।
- শিক্ষকের উচ্চারণ হবে স্পষ্ট।
- শিক্ষক হবেন ধৈর্যশীল।
- সাধু ভাষার সঙ্গে চলিত ভাষা মিশ্রিত না হয়।
ভাষার ব্যবহার সঠিক হলেই শিক্ষন প্রক্রিয়া যথার্থ হয়। তাই শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থী কোনো কিছু বলার সময় যদি ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণ করে, বক্তব্য সঠিক ভাবে বুঝতে না পারে, আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে তবে শিক্ষক সেদিকে যত্ন নেবেন। শিক্ষার্থীর সমস্ত ভুলত্রুটি সংশোধন করবেন।
ভাষার কার্যাবলী (Function of Language)
শিক্ষার বাহন হিসাবে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম এর সর্বময় কার্যকারিতা গুলি-
- প্রচলিত কিংবদন্তি কথা কাহিনী। নানা ধর্মগ্রন্থ, আঞ্চলিক সাহিত্য লোকসাহিত্য ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা হয়। জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার সহায়ক।
- ভাষার মাধ্যমে ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ আত্মপ্রকাশ করে, সমাজজীবনে সামঞ্জস্য সাধনকরে এবং নিরাপদ অস্তিত্ব রক্ষা অব্যাহত রাখে।
- সামাজিক মানসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব, প্রেম, অস্তিত্ব রক্ষা অব্যাহত রাখে।
- সৌন্দর্যচেতনা সৃজনক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
- বৌদ্ধিক ও প্রক্ষোভিক বিকাশে সহজ ও সুন্দর তৃপ্তিদায়ক মাধ্যম হিসাবে ভাষার কার্যকারিতা অনস্বীকার্য।
ভাষা শিক্ষার ব্যাকরণের ভূমিকা (Critical Perspective on the role of Grammar)
ভাষা হল ভাবের বাহন। ব্যাকরণ তার বিজ্ঞান অর্থাৎ ব্যাকরণ ভাষার বিজ্ঞান। যে বিদ্যার দ্বারা বাংলা ভাষাতে নির্ভুল ভাবে বলতে, পড়তে ও লিখতে পারা যায় তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে। অন্য ভাবে ভাষার বিশ্লেষণ প্রভৃতি প্রয়োগরীতি ও স্বরূপ আলোচনা বা ব্যাখ্যা করে এমন শাস্ত্রকে ব্যাকরণ বলে। বাঙালীদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ লেখেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতকুমার চট্টোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, শ্যামাপদ চক্রবর্তী, সুকুমার সেন, ব্যাকরণকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করান।
ব্যাকরণ শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য:
মূলত চারটি উদ্দেশ্য (1) শুদ্ধভাবে লিখতে পারা (2) বলতে পারা (3) পড়ে বুঝতে পারা (4) শুনে বুঝতে পারা।
- শিক্ষার্থীকে ভাষার কথনে অনুরাগী করা এবং নিয়মগুলিকে সহজ করা।
- বৃহত্তর উদ্দেশ্য - ভাষা ও সাহিত্যে আগ্রহবর্ধন ও সাহিত্য রস উপলব্ধি করা।
- প্রাসঙ্গিক উদ্দেশ্য- বাক্যের মধ্যবর্তী পদগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক উপলব্ধি করা।
- ভাষার তাত্ত্বিক রূপকে ফুটিয়ে তোলা এবং শুদ্ধভাবে সাহিত্য রচনা করতে উৎসাহিত করা।
- শিক্ষার্থীর মধ্যে তর্ক ও যুক্তি শক্তির বিকাশ এবং সৃজন শক্তির উল্লেখ সাধন করা।
- বাক্য শব্দ এবং বর্ণ বা অক্ষর যোজনার মধ্যে স্বীকৃত রূপে জ্ঞান লাভে সাহায্য করা।
- তাত্ত্বিক ব্যাকরণ অপেক্ষা ব্যাবহারিক ব্যাকরণের প্রতি জোর দিয়ে শিক্ষার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আরো স্বার্থক হতে সাহায্য করা।
- ব্যাকরণ চর্চার ফলে যতিচিহ্ন বা বিরতি চিহ্নের যথাযথ জ্ঞান বৃদ্ধি সহায়ক।
ব্যাকরণ শিক্ষাদানের সমস্যা:
- ব্যাকরণ একটি শুষ্ক, নিরস, জটিল বিষয়, তাই শিক্ষার্থী এই বিষয়ে অনীহা বেশি।
- ব্যাকরণকে সরস, সুন্দর, আকর্ষণীয় করে পড়াবার আগ্রহ অনেক শিক্ষকের থাকে না।
- গতানুগতিক প্রচলিত যান্ত্রিক পদ্ধতি, ব্যাকরণ পঠন পাঠনের প্রতিবন্ধক।
- শিক্ষক সহায়ক নানা উপকরণ (চক, বোর্ড, চার্ট, মডেল ইত্যাদি) -এর অভাবে ব্যাকরণ পাঠ আনন্দদায়ক হয় না।
- পরীক্ষা বিশেষ ছাড়া ব্যাকরণ বিষয় উপযোগিতা না থাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যাকরণ পাঠে অনাগ্রহী হয়।
ব্যাকরণ শিক্ষাদানের পদ্ধতি:
- সূত্র পদ্ধতি: প্রত্যেকটি সূত্রকে ভালোভাবে মুখস্থ করাকে সূত্র পদ্ধতি বলে। এটি পুরাতন পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অবৈজ্ঞানিক হলেও এর প্রচলন যথেষ্ট বেশি।
- ভাষা পদ্ধতি: সাহিত্য পড়াতে পড়াতে ভাষার মধ্যে ব্যাকরণের নানা প্রয়োগ দেখিয়ে ধীরে ধীরে ব্যাকরণ সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
- ব্যাকরণ পাঠ্যপুস্তক পদ্ধতি: ব্যাকরণ পাঠদানের প্রতিটি অধ্যায় বুঝে মুখস্থ করলে শিক্ষার্থীরা পুস্তককেন্দ্রীক হয়ে ওঠে।
- বিশ্লেষণ পদ্ধতি: সূত্রগুলিকে উদাহরণের সাহায্যে বারবার বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীর কাছে উপস্থাপন করা হয়।
- অবরোহী পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে সূত্র থেকে, উদা জ্ঞান আহরণের রীতিতে যাওয়া হয়। বর্তমানে এই পদ্ধতি খুবই প্রচলিত।
- আরোহী পদ্ধতি: বর্তমানে এই পদ্ধতিকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকার করা হয়েছে। এই পদ্ধতি অবরোহী পদ্ধতির বিপরীত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে উদাহরণগুলি বিশ্লেষণ করে শেষে সুত্র মূলক সিদ্ধান্তে আসা হয়।
ব্যাকরণ শিক্ষাদানে শিক্ষকের ভূমিকা:
ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাকরণ বিষয়ে শিক্ষকের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। বিষয়গুলি হল-
1. সাধু চলিত্র রূপ, বানান ভুল ও বানান সংস্কার, অনুসর্গ ও উপসর্গ সমূহ। 2. পদান্তর প্রতিশব্দ, বচন ও লিঙ্গ পরিবর্তন। 3. বাক্য গঠন ও তার পরিবর্তন রীতি। 4. হস্তাক্ষর ভালো হওয়া বাঞ্ছনীয়। 5. ধৈর্য্য সহকারে পড়াবার ক্ষমতা।
ব্যাকরণ শিক্ষার স্তর ভেদে শিক্ষকের মানসিক প্রস্তুতি:
1. ব্যাকরণ বুদ্ধিগ্রাহ্য বিষয় শিশুর বুদ্ধির কিছুটা পরিপক্কতা না এলে ব্যাকরণ পাঠ শুদ্ধ করা যায়না। 2. উদাহরণ থেকে সূত্রে আসা ব্যাকরণের একটি বিশেষ দিক, এই সূত্রকে উপলব্ধি করার মতো মানসিক প্রস্তুতি দরকার। 3. বিষয় থেকে ভাবের মূর্ত থেকে বিমূর্ত বা তাত্ত্বিক থেকে ব্যাবহারিক পর্যায়ে উত্তরণের মতো মানসিক প্রস্তুতি অর্জন করতে শবে।
ভাষাগত দক্ষতা (Language Skill)
ভাষা শিক্ষার প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বিকাশ ও দক্ষতা যে ধারা অনুসরণ করে অগ্রসর হয় তা হল: জ্ঞানের সঞ্চয় → বোধের উন্মেষ → অভিজ্ঞতার প্রয়োগ → দক্ষতার প্রকাশ।
ভাষার দক্ষতা:
- গ্রহণধর্মীতা: শ্রবণ, পঠন
- প্রকাশধর্মীতা: কথন, লিখন
শিক্ষক শিক্ষিকাকে মূলত চারটি দক্ষতার উপর গুরুত্ব দিতে হবে: শ্রবণ, কথন, পঠন, লিখন। ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বিশেষ কয়েকটি দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে:
- জ্ঞানমূলক সামর্থ্য: বিভিন্ন প্রতীক চিহ্ন, যতি, সূত্র, সংজ্ঞা, তথ্য ইত্যাদি জানতে ও চিনতে পারবে।
- বোধমূলক সামর্থ্য: বিভিন্ন পদ, ছেদ, যতি, চিহ্ন প্রতীক সূত্র, সংজ্ঞা, তথ্য ইত্যাদি সম্পর্কে তার অর্জিত জ্ঞানকে বোধ মূলক কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারবে।
- প্রয়োগমূলক সামর্থ্য: শিক্ষার্থীর বিকাশ এমন একটি স্তরে উন্নীত হবে যার ফলে সে তার সমাজে, পরিবার ও ব্যাক্তি জীবনে নতুন নতুন বাস্তব সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি নির্ণয় করতে সমর্থ হবে।
- দক্ষতামূলক সামর্থ্য: শিক্ষার্থীর জ্ঞান, বোধ, প্রয়োগ মূলক সামর্থ্যের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার ইন্দ্রিয় সঞ্চালনের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং বলা যায় সে নিখুঁতভাবে লিখতে, আঁকতে, অঙ্গ সঞ্চালন করতে পারবে। শ্রবণ, কথন, পঠন ও লিখনে দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। আবৃতি, অভিনয়, বিতর্ক, বক্তৃতা প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শিতা লাভ করতে পারবে।
বৈচিত্র্যময় শ্রেণিকক্ষে ভাষাশিক্ষার চ্যালেঞ্জ (Challenges of Teaching Language in a Diverse classroom)
ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য জীবনী শক্তির একটি প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যে দৈহিক ও মানসিক পার্থক্য বর্তমান। শ্রেণি কক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মানসিক ক্ষমতা, প্রবণতা, আগ্রহ, বুচি, স্মৃতি, জণকত্ব, পরিবেশগত প্রভাব, সৃজনশীলতা, মনোযোগ, অভ্যাস, চরিত্র একে অপরের থেকে পৃথক। এই সব শিশুদের নিয়ে গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় শ্রেণিকক্ষ। ব্যাক্তিগত বৈষম্যের সূত্র ধরে বিচার করলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় যে, সব শিক্ষার্থী একইসঙ্গে সব ব্যাপার বুঝতে পারে না। সেক্ষেত্রে শিক্ষক মহাশয় কীভাবে ওই সব পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিয়ে যাবেন তা একটা ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।
বৈচিত্র্যময় শ্রেণিকক্ষেভাষা শিক্ষা প্রদানের জন্য শিক্ষক মহাশয়দের কিছু ঝুঁকি-দায়িত্ব-সাবধানতা গ্রহণ করতে হবে:
- প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দুর্বলতাগুলিকে জানতে হবে।
- বিভিন্ন ধরনের শিখন প্রণালীর মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে।
- শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরী করতে হবে।
- প্রতিটি শিশুকে দলবদ্ধ করে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
- শিক্ষক মহাশয় সেই বিষয়ে নিজে কতটা উপযুক্ত তার বিচার করা।
- প্রতিটি শিশুর চাহিদা পুরণ করার চেষ্টা করতে হবে।
- শিক্ষকের মনোবৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা (Language difficulties):
ভাষা শিক্ষা প্রদানে শিক্ষার্থী অপেক্ষা শিক্ষককে বেশি দায়িত্ববান হতে হবে। শিক্ষক যা বলবেন শিক্ষার্থী তাই আত্তীকরণ করবে, এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর কোনো দায়িত্ব যেমন থাকে না তেমনি শিক্ষার্থীর শ্রবণ দুর্বলতার জন্যও পাঠ আত্তীকরণ করা সম্ভব হয় না। তাই উভয়েরই সচেতনতা আবশ্যক। তাই শ্রেণিকক্ষে সকল বিষয়ে নজর দিয়েও কিছু কিছু সমস্যা থেকেই যায়। যেমন-
- শিক্ষক বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণার অধিকারী কিনা।
- শিক্ষকের পরিবেশ ভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ কিনা।
- ভাষার ব্যবহার ও উচ্চারণভঙ্গি শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য কিনা।
- শিক্ষকের উপযুক্ত পদ্ধতির প্রয়োগ না করা।
সমাধান:
1. কঠিন ও অসুবিধাপূর্ণ পাঠকে বারে বারে পরিবেশন করা। 2. শিক্ষার্থীদের আত্তীকরণের বিষয়বস্তু পরিমাপ/মূল্যায়ন করা। 3. ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ বিষয় না বলা। 4. শিক্ষার্থীদের অসুবিধা বোঝার চেষ্টা করা। 5. পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বেশি করে সাহায্য করা। 6. শিক্ষকদের মনোবৈজ্ঞানিক ভাবে শিক্ষাদান।
ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি (Errors):
বৈচিত্রময় শ্রেণিকক্ষে ভাষা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকের কিছু ভুলভ্রান্তি থাকে সেগুলি তার নিজস্ব ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিসাধন করে। যেমন-
1. নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবা। 2. নিজের প্রতি কঠোর ভাবে আত্মবিশ্বাস থাকা। 3. নিজের ভুলকে স্বীকার না করার প্রবণতা। 4. নিজেকে সমস্ত বিষয়ে জ্ঞানী বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা।
বৈচিত্র্যময় ক্লাসে ভাষা শিক্ষার অসামঞ্জস্য (Disorders):
পৃথিবীতে কোনো বস্তু বা ব্যক্তি অপর কোনো বস্তু বা ব্যক্তির সঙ্গে একই সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। উভয়ের মধ্যে কোনো না কোনো পার্থক্য অবশ্যই থাকবে। সেই রকম ভাবে শিক্ষক মহাশয়দের মধ্যে অসামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়।
শিক্ষকের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা:
- প্রত্যেক শিক্ষকের পরিবেশন ভঙ্গি বিভিন্ন হয়।
- প্রত্যেক শিক্ষকের জ্ঞানের পরিধি বিভিন্ন।
- প্রত্যেক শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ শক্তি ও চিন্তাশক্তি ভিন্ন।
- প্রত্যেক শিক্ষকের দূরদর্শীতার ক্ষমতা ভিন্ন।
- প্রত্যেক শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ শক্তি ও চিন্তাশক্তি ভিন্ন।
- প্রত্যেক শিক্ষকের ব্যক্তিত্বের পার্থক্য থাকে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা:
- প্রত্যেকের আগ্রহ আলাদা।
- গ্রামাঞ্চলের এবং শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারদর্শীতার পার্থক্য দেখা যায়।
- শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্ক আলাদা হয়।
- সকল সমবয়স্ক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বুদ্ধাঙ্ক সমান নয়।
